সন্ধ্যাবেলা নদীঘাট থেকে হাতপা ধুয়ে ঘরে ফেরার পথে তাইবা প্রথম দেখেছিল মহিলাটিকে। ঘাটের পাড়ে বিশাল তেঁতুল গাছটার আড়ালে চুপচাপ দাঁড়িয়েছিল। বাড়ির নলকূপের হাতলটি চৈত্র মাসের ভরে বিদ্রোহ করে বসায় হাতপা ধুতে ওকে যেতে হয়েছিল নদীঘাটে। ফেরার পথে তেঁতুলতলায় এসে ভর সন্ধ্যার ডরে দ্রুত পা চালাতে গিয়ে থমকে দাঁড়াল।
গাছটার পাশে স্থাণুর মতো দাঁড়িয়ে আছে একটি মেয়েলি ছায়ামূর্তি। কাজল সন্ধ্যার আবছা আলোতে চোখে পড়ছে তার নারীকায়াটি। পরনের বেশভূষা ভারি অদ্ভুত। শাড়ির ওপর পিরান চাপিয়ে লম্বা আঁচলটি ফেলে রেখেছে পেছন দিকে। মাথাভরতি ঝাঁকড়া চুল। ঘাড়টি হালকা বাঁ দিকে হেলানো। কচুর কন্দ থেকে ছাড়ানো লতার মতো নেতিয়ে আছে হাত দুটো।
দেখে তাইবার বালিকামন ভয়ে কুলহুআল্লাহ পড়তে শুরু করল। হঠাৎ ছায়ামূর্তিটি পিলে চমকে দিয়ে পথরোধ করে দাঁড়াল। আবছা আলোতে তাইবা দেখল, আজদাহা কায়াটি ওর দিকে এগিয়ে আসছে। উপায়ান্তর না দেখে ও সজোরে চিৎকার পাড়ল, ‘অ মায়া গো, আমারে মাইরেল্ল!’
তাইবার চিৎকারে কয়েকটি পাতিকাক সন্ধ্যার নীরবতা ভেঙে তেঁতুলের ডাল ছেড়ে কা কা করে উড়ে গেল। সেসময় ঘাটপাড়ে দিনশেষের ধোয়ামাজা করতে আসছিল পাশের বাড়ির আসমা। তাইবার ভয়ার্ত চিৎকারে থেমে গেল তার হাঁটার গতি। ভীত চোখে এদিক-ওদিক তাকিয়ে উদ্বিগ্ন গলায় বলল, ‘কেলা গো এইলা? কিতা অইছে?’
বলতে বলতে হাতের জিনিসপত্র মাটিতে নামিয়ে রেখে আওয়াজের উৎসের দিকে ছুটে গেল।
তেঁতুলতলার ধুলোতে বসে দুহাতে মুখ ঢেকে কাঁদছিল তাইবা। আসমা দুরুদুরু বুকে ওর কাঁধে হাত রাখল, ‘অই ছেরি, তাইবা না এইলা? কিলো তর কিতা অইছে? এমনে কান্তাছস কেরে?’
আসমার করস্পর্শ পেয়ে ভয়াতুর তাইবা তড়াক করে উঠে দাঁড়াল। তাকে জড়িয়ে ধরে কান্নায় ভেঙে পড়ল, ‘অ ফুআম্মা গো, আমারে বাঁচাও! অই বেডি আমারে মাইরেল্ল!’
আসমা ছানাবড়া চোখে এদিক-ওদিক তাকাল। সন্ধ্যার অন্ধকার ছাড়া আর কিছু চোখে পড়ল না।
‘এই ছেরি কিতা কছ, কোন বেডি তরে মাইরেলব? কই, এহানে ত কুনো বেডিটেডি নাই।’
তাইবা বিড়ালের তাড়া খাওয়া আহত চড়ুইছানার মতো ককিয়ে উঠল, ‘না ফুআম্মা, অইযে তেতইগাছের ধারও বেডিডে খাড়ইয়া রইছে।’
আসমা তীক্ষ্ন চোখে তেঁতুল গাছটার দিকে তাকাল। দৃষ্টির দুরবিনে খুঁজে পেল না কাউকে। কপট রাগ দেখাল, ‘এই ছেরি, তিন সামারক্ত কী ভুলভাল দেখছস। ল, চালায়া বাড়িত যাই।’
তাইবাকে জড়িয়ে ধরে ওর মাথায় সান্ত্বনার হাত বুলাতে বুলাতে আসমা বাড়ির দিকে হাঁটা দিল।
তারা দুজন তেঁতুল গাছের সীমানা পেরিয়ে যাওয়ার পর হঠাৎ নড়ে উঠল আড়ার ঢোলকলমির ঝোপঝাড়টি। তখন যদি আসমা একবার পেছন ফিরে তাকাত, দেখতে পেত তাইবার বয়ানমতো একটি নারীকায়া সন্ধ্যার মিশমিশে অন্ধকারের ভেতর পা বাড়িয়েছে পশ্চিমপাড়ার দিকে।
দুই.
মাটির চুলোয় তরকারি চাপিয়ে ভাতের ডেগে লুসোন দিচ্ছিল আকলিমা। রাতের রান্না হতে হতে আজ সন্ধ্যা পেরিয়ে গেছে। ঘরকন্নায় নিপুণা আকলিমার আর কোনোদিন এমন হয়নি। অন্যদিন বিকেলের রোদ হলুদ থাকতে থাকতে রান্নাবান্না শেষ করে আজাড় হয়ে যায়।
আজকের ব্যতিক্রমটা হয়েছে তার স্বামী লেয়াকতের কারণে। লেয়াকত সেই দুপুরে গঞ্জের হাটে গিয়েছিল বাজারসদাই করতে। আকলিমা তাকে বলে দিয়েছিল বেলাবেলি ফিরে আসতে। দিনকাল এখন বেজায় মন্দ যাচ্ছে। দেশে দেশে নাকি একটা নতুন রোগের ছড়াছড়ি হচ্ছে। রোগটা ছোঁয়াছুঁয়ির মতো। এই রোগে ভিড়ভাট্টার মাঝে থাকা বারণ। এ নিয়ে সরকারিভাবে প্রচারণা চালানো হচ্ছে। এজন্য মানুষজন আগের মতো আর বাইরে বেরোতে পারছে না। রাস্তায় রাস্তায় চলছে পুলিশ ও সেনাবাহিনীর টহল। অকারণে তো অবশ্যই; এখন জরুরি দরকারে বেরোলেও জবাবদিহি করতে হচ্ছে।
আকলিমা পাড়াগেঁয়ে অবলা। সে এত কিছুর খবর রাখতে পারে না। ভাসা ভাসা যেসব খবর পায়, এর কিছু তার স্বামীর থেকে আর কিছু পাশের বাড়ির কলেজেপড়া মেয়েগুলোর থেকে শোনা। করোনা ভাইরাস নামের এই রোগে সারাবিশ্বে প্রতিদিনই অসংখ্য মানুষ মারা যাচ্ছে। চারদিকেই এখন মৃত্যুর মিছিল। এসব ভাবতে ভাবতে আকলিমা ভাতের ডেগে লুসোন শেষ করল, গোবর ঘুঁটের জ্বালটা ঠেলে দিল চুলোর ভেতরে। তারপর গালে হাত রেখে চুপচাপ তাকিয়ে রইল আগুনের দিকে।
ঘর থেকে লেয়াকত তাড়া লাগাল, ‘কী গো, রান্ধা অইছে না! ভাত দিয়া যাও। ভুখ লাগছে তো।’
স্বামীর ডাকে ধ্যান ভাঙল আকলিমার। ঝটপট উত্তর দিল, ‘হ্যাঁ গো, অয়া গেছে। আইতাছি।’
খুন্তি দিয়ে তরকারিটা আরেকবার ঘেঁটে নিল। চাক চাক কাঁচাকলাগুলো টুকরো টুকরো মাগুর মাছের সাথে সরুয়ার ভেতর টগবগ করছে। খুন্তির আগায় একটু সরুয়া নিয়ে জিহ্বায় চেখে দেখল। বেড়ে রান্না হয়েছে। তার স্বামী কাঁচাকলা দিয়ে মাগুর মাছের ঝোল খাবে বলে বাজারের ব্যাগ হাতে সূর্যডোবার সাথে সাথে বাড়ি ফিরেছিল। আকলিমা তখন চিন্তিত মুখে বসে ছিল বারান্দায়। স্বামীকে ডেউড়ি পেরিয়ে ভেতরে ঢুকতে দেখে তার দুশ্চিন্তার কালো মেঘ উড়াল দিয়ে পালাল ঘনায়মান সন্ধ্যার দিকে।
লেয়াকত স্মিতমুখে বাজারের ব্যাগটা তার হাতে দিয়ে বলল, ‘নেও গো বউ, সইন্ধার লগে লগে ফিরে আইছি। কাঁচাকলা আর মাগুর মাছ আনছি। জলদি রান্ধা বওয়াও। পেডে ভুখ লাগছে বেশি।’
আকলিমা হাসি হাসি মুখে মেকি অভিমানের কুঞ্চন ফুটিয়ে বলল, ‘আইগো ব্যাডার আওশ, তে আজ গ না-ই আইতা! কইয়া দিছিলাম বেলাবেলি ফিরে আইবা। এহন আইছ তিন সামারক্ত। কুনো আন্তাজ নাই লোকটার। আমি কোম্বালা কিতা করাম!’
আকলিমা সন্ধ্যার আবছা আলোতে হেঁশেলে বসে গেল তরকারি আর মাছ কুটতে। ঠ্যাংঅলা দায়ে কাঁচাকলার বাকল ছাড়াতে ছাড়াতে লেয়াকতকে তাড়া লাগাল, ‘কী গো, যাও জলদি, ঘাডেত্তে গোসলডা দিয়া আও। তুমি আইতে আইতে আমার রান্ধা অয়া যাইব।’
লেয়াকত ‘হ যাই’ বলে গামছা গলায় বসে পড়ল বউয়ের পাশে। আকলিমা মাগুরমাছের কাটাকুটি করতে করতে একফাঁকে দেখে নিল লেয়াকতের উদোম চওড়া বুকটা। মিটিমিটি হেসে ইঙ্গিতবহ আজ্ঞা দিয়ে বলল, ‘কী গো, ঘাডে যাও। এহানে বয়া পড়ছ কেরে? নাকিতা আরও কিস্তা বাহি আছে!’
ঠোঁট টিপে সলাজ হেসে উঠল আকলিমা। লেয়াকত বউয়ের ইশারা বুঝতে পেরে মৃদু হাসল। নিস্তরঙ্গ গলায় বলল, ‘বউ গো, রঙ্গের দিন তো শ্যাষ অয়া যাইতাছে। করোনা ভাইরাসের ঠেলা য্যামনে আইতাছে, আল্লায় জানে কোম্বালা কিতা অয়া যায়!’
লেয়াকতের কথায় আকলিমার বুকের ভেতরটা ছ্যাঁৎ করে উঠল। সে মাছ কুটা থামিয়ে উৎকণ্ঠিত গলায় জানতে চাইল, ‘কী কও, নতুন কইরে আরেকবালি কিস্তা শুরু অইছে নাকিতা?’
লেয়াকত দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল, ‘নতুন আর কিতা, খবর তো ডেইলি একটাই শোনা যাইতাছে। খালি রোগে ধরা আর মানুষ মরা। আজগো দেখলাম সরকার সব বাজারহাটও বন্ধ কইরে দিছে। খালি কাঁচামাল আর ওষুধের দোহান খোলা থাকব।’
‘ইয়াল্লা, তাইলে মানুশ কিতা খায়া বাঁচব!’
‘কিতা আর, নুনপানি যার যেমন আছে।’
‘আয় আল্লা, আল্লা গো!..’ আকলিমা প্রবল উৎকণ্ঠায় বিড়বিড় করতে লাগল।
লেয়াকত বউকে সান্ত্বনা দিল, ‘আইচ্ছে থউ এইতা আলাপ। চালায়া রান্ধা সারো। আমি ঘাডেত্তে গোসলডা দিয়া আই।’
লেয়াকত আড়মোড়া ভাঙার ভঙ্গিতে শরীর টান দিয়ে উঠে দাঁড়ল। লুঙ্গি কাঁধে হাঁটা দিল নদীঘাটের দিকে। ততক্ষণে কাজল গাঁয়ে সন্ধ্যা নেমে এসেছে আর তেঁতুলতলার ঘটনাপ্রবাহ বাঁক ঘুরিয়ে ধেয়ে আসছে আকলিমার হেঁশেলের দিকে।
ঘরের চৌকির ওপর বসে লেয়াকত বউকে আবার তাড়া লাগাল, ‘কী গো বউ, অইছে না? আর কত!’
আকলিমার ব্যস্ত গলায় উত্তর দিল, ‘আইতাছি গো, আইতাছি। শ্যাষ।’
কথা ছিল, নদীঘাট থেকে লেয়াকত গোসল দিয়ে আসতে আসতে আকলিমার রান্নাবাড়া হয়ে যাবে। কিন্তু ততক্ষণে শুধু ভাত হয়ে তরকারির ডেগ চুলোয় চেপেছে। এই অবেলায় রান্নাবান্নার ব্যাপারটা আকলিমা নিপুণা হয়েও একা হাতে সামাল দিতে পারেনি। কেউ একজন পাশে হলে, একটা বাড়ন্ত মেয়ে বা ছেলে, যে মায়ের রান্নার সময় ঘর থেকে এটাসেটা এগিয়ে এনে দেবে, তাহলে খুব ভালো হতো; শত ব্যস্ততায়ও নির্ভার লাগত। কিন্তু তাদের বিয়ের আজ দশ বছর হতে চলল, এখনো কোনো সন্তানাদি হয়নি।
এ নিয়ে প্রথম প্রথম আকলিমার খুব দুঃখ হতো। কিন্তু লেয়াকতের অফুরান ভালোবাসা আর প্রাণোচ্ছল সান্ত্বনায় দুঃখের নদী হৃদয় খুঁড়ে অতটা গভীরে বয়ে যেতে পারেনি। তারপরও ক্ষণে ক্ষণে আকলিমার মনে একটা দুঃখরেখা দাগ কাটে—‘ইশ, যদি একটা মেয়ে বা ছেলে হতো, যে বাবামায়ের টুকটাক ফাইফরমাশ খেটে দিত!’
স্বামীর পাতে ভাতের সব বন্দোবস্ত করে দিয়ে আকলিমা পা বাড়াল হেঁশেলের দিকে। লেয়াকত পেছন থেকে ডাক পাড়ল, ‘কী গো, যাও কই? তুমিও আমার সাথে বয়া পড়ো!’
আকলিমা টোলপড়া গালে মিষ্টি হেসে উত্তর দিল, ‘আইতাছি। চুলার ভিত্তে দুইডে কলা পুড়াত দিছি। ভত্তা বানায়াম, লইয়া আই।’
‘কলার ভত্তাও করবা! আইচ্ছে তে।’ লেয়াকত স্মিতমুখে ভাতের নলা মুখে পুরল।
আকলিমা অন্ধকার হেঁশেলে খুন্তি দিয়ে চুলোর ভেতর থেকে পোড়াকলা দুটো বের করছিল। তখনই তেঁতুলতলায় উদয়-হওয়া বিসদৃশ নারীকায়াটি এসে তার সামনে প্রকট হলো। আকলিমা অন্ধকারের নিজস্ব আলোতে কিছু একটার উপস্থিতি টের পেয়ে তড়াক করে সামনে তাকাল। নারীকায়াটি তাকে আর ভাবনার সুযোগ না দিয়ে ধপ করে পাশে বসে পড়ল। আকলিমা ভয়ে গলার জোরে ‘অ আল্লাগো’ বলে দুহাত দূরে ছিটকে পড়ল।
বউয়ের চিৎকারে লেয়াকত হন্তদন্ত হয়ে বেরিয়ে এলো। আকলিমাকে হেঁশেলের সামনে মাটিতে পড়ে থাকতে দেখে জলদি গিয়ে ধরল। স্বামীর ছোঁয়া পেয়ে আকলিমা ভয়ে প্রায় সেঁধিয়ে গেল তার বুকে। বউয়ের এমন ভয়কাতরতা লেয়াকতকে উদ্বিগ্ন করে তুলল। সে তাকে নিবিড়ভাবে জড়িয়ে ধরে বলল, ‘এই আকলিমা, কিতা হইছে তোমার? কিতা দেইক্কে ডরাইছ, কও আমারে?’
স্বামীর অভয়স্পর্শ পেয়েও আকলিমার মুখে রা ফুটল না। সে হেঁশেলের দিকে হাত ইশারা করল। তখন অন্ধকারের আবছা আলোয় লেয়াকতেরও চোখে পড়ল নারীকায়াটি। কেমন বউঘোমটা দিয়ে চুপচাপ বসে আছে তাদের হেঁশেলে। দেখে সে পুরুষোচিত গলায় চেঁচিয়ে উঠল, ‘অ বেডি, কেলা তুমি? এহানে কিতা করো?’
নারীকায়াটি নিশ্চুপ, নতমুখ।
লেয়াকত আবারও চেঁচিয়ে উঠল, ‘অ বেডি, রাও করো না কেরে? কেলা?’
এতগুলো জিজ্ঞাসার কোনো জবাব না পেয়ে এবার তার মেজাজ চড়ে গেল। আকলিমাকে বসিয়ে রেখে উঠে দাঁড়াল সে। মুখ দিয়ে ছাড়ল পুরুষত্বের ঝাঁজালো গালি, ‘চু..রানির বেডি, তুই আমার রান্ধাঘরে কিতা করছ? বাইরয়া আ কইতাছি!’
তিন.
হেঁশেলের খুঁটির সাথে বেঁধে রাখা হয়েছে মহিলাটিকে। স্ত্রীর সামনে নিজের পৌরুষ জাহির করতে লেয়াকতকে এ কাজটি করতে হয়েছে। তখন ভয়ে-বিস্ময়ে আকলিমা এমনই হকচকিয়ে গিয়েছিল, চোখের সামনে তার স্বামী এক পরনারীর সাথে ধস্তাধস্তি করে পরিহিত শাড়ির আঁচল দিয়ে তাকে বেঁধে ফেলছে আর এ কাজটি তার কাছে উচিত ও স্বাভাবিক বলে মনে হচ্ছিল। ঘটনার আকস্মিকতা তাকে কিছুক্ষণের জন্য মূক করে দিয়েছিল। সে বিস্ফারিত চোখে তাকিয়ে দেখছিল সব।
কাজ শেষে লেয়াকত ঘন ঘন শ্বাস ফেলে উঠোনে ফিরে এলো। আকলিমা তখনো বিমূঢ় হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। লেয়াকত এসে তার কাঁধ ধরল, ‘এ্যাই বউ, তুমি ঠিক আছ ত?’
স্বামীর আলতো ঝাঁকুনিতে ধাতস্থ হলো আকলিমা। স্বামীকে দুহাতে জড়িয়ে ধরে ত্রস্ত গলায় বলল, ‘কী গো, আল্লা আমরারে কুন বিপদে ফালাইলো! এই বেডি কেলা? কইত্থে আইছে?’
লেয়াকত তার চুলে হাত বুলিয়ে বলল, ‘তুমি অত ডরাইয়ো না! ঘরে যাইয়া কুপিডে লয়া আও। পরে দেখতাছি কিতা অইছে।’
উত্তেজনা মনে চেপে স্বামীর কথামতো আকলিমা ঘরে গেল। চৌকির ওপর বন্দোবস্ত বাড়া ভাতের আধখাওয়া দেখে তার ভেতরটা রাগে-দুঃখে বিষিয়ে উঠল। আহারের মুহূর্তে এই উটকো মহিলাটা কোত্থেকে এসে জুটল তাদের ঘাড়ে!
কুপি জ্বালিয়ে উঠোনে এসে আকলিমা একটা ধাক্কার মতো খেল। পাশের বাড়ির রইসুদ্দিন, আলম মিয়া আর আম্বিয়া বানু দেউড়ি পেরিয়ে তার স্বামীর নাম ধরে ডাকতে ডাকতে উঠোনে আসছে। আকলিমা কুপির আলোতে লেয়াকতের দিকে তাকাল। সাথে সাথে তার চোখ চলে গেল হেঁশেলের খুঁটিতে বাঁধা মহিলাটির দিকে। সাজপোশাকে তাকে কেমন পাগলির মতো দেখাচ্ছে। চোখেমুখে ধুলোর পুরু আস্তরণ। মাথায় কাঁধদোলানো উস্কোখুস্কো চুল। গায়ে লাল পাড়ের ঘিয়েরঙা শাড়ির ওপর লম্বা পিরান চাপানো। তার এই বেঢপ সাজসজ্জা দেখে আকলিমার বোধ হলো, তারা একটা পাগলিকে বেঁধে রেখেছে।
আকলিমা কুপি হাতে লেয়াকতের পাশে দাঁড়াল। রইসুদ্দিন এগিয়ে এসে তাদের ওপর জিজ্ঞাসু দৃষ্টি ফেলল, ‘কীরে লেকত, তরার বাড়িত্তে কিয়ের চিল্লাচিল্লি হুনা যাইতাছে?’
তাদের জবাব দেয়ার আগেই আম্বিয়ার দৃষ্টি চলে গেল হেঁশেলে। সে ছানাবড়া চোখে আকলিমার দিকে তাকাল, ‘কী গো বউ, এই বেডি কেলা? এইলারে এহানে এ্যামনে বাইন্ধে থইছ কেরে?’
লেয়াকত একটা লম্বা দম ফেলে ‘আর কইয়ো না বুজি, এই এই সমাচার’ বলে দুয়েক কথায় তাদের ঘটনার বৃত্তান্ত শোনাল। শুনে রইসুদ্দিন মাথা নাড়ল। আলম মিয়া হাতের চেটোয় মুখ মুছে বলল, ‘বেডির মতিগতি তো ভালা দেহা যাইতাছে না। চুরিটুরি করতে আইছিন নাকিতা!’
আকলিমা হাতের কুপিটা মুখের একদিকে সরিয়ে কিছুটা ঝাঁজালো গলায় বলল, ‘নাইলে আর কিতা অইব, চুরির নিয়ত না থাকলেও এই বেডি আমারে আজগো মাডার কইরে ছাড়ল!’
আম্বিয়া দুপা এগিয়ে মহিলার দিকে সরু সরু চোখে তাকিয়ে বলল, ‘বউ গো, আমার ত বেডিডেরে হাগল হাগল মনে অইতাছে!’
‘হ বুজি, আমারও এইডে মনে অইছে।’
‘তে এই হাগলনি আইছে কইত্থে?’
‘এইডেই তো জানতারতাছি না!’
লেয়াকত আকলিমার হাত থেকে কুপিটা নিয়ে হেঁশেলের দিকে কয়েক পা এগিয়ে গেল। মহিলাটির মুখের সামনে বাতি ধরে কড়া গলায় জিজ্ঞেস করল, ‘এ্যাই বেডি, তুমি কইত্থে আইছ? বাড়ি কোনহানে?’
মহিলা ফ্যালফ্যালে চাহনি নিয়ে বাতির দিকে তাকিয়ে রইল। শুরুর ধস্তাধস্তির পর থেকে সে কেমন নির্লিপ্ত হয়ে রয়েছে। বেশ কজন মানুষ তাকে নানানভাবে নিরীক্ষণ করছে অথচ সে নির্বিকার।
লেয়াকত কুপি হাতে মহিলার খুব কাছাকাছি চলে গিয়েছিল। হঠাৎ আলম মিয়া কী মনে করে তাকে সাবধানী সংকেত দিয়ে উঠল, ‘লেকত ভাই, সাবধান বেডিরে আর ছইয়ো না। আমার কেমন সন্দে অইতাছে, এই বেডি কুনো ষড়যন্ত্র অইতা পারে।’
‘কীরম ষড়যন্ত্র রে আলম?’ কথার নতুন মোড় পেয়ে রইসুদ্দিন জিজ্ঞেস করল।
আলম সচেতন নাগরিকের মতো তাকে জানাল, ‘হুনতাছ না দেশে কী মহামারি শুরু অইছে। আমি হুনছি রোহিঙ্গারার অনেকেই করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত। এই বেডির বেশভূষা দেইক্কে তো রোহিঙ্গার মতো মনে অইতাছে। ভাইরাস লয়া পলায়া আইতারে। আরো হুনতাছি, হাসপাতাল তে এই রোগ লয়া রোগীরাও নাকি পলায়া যাইতাছে গা।’
আলমের কথাগুলো সবাইকে খুব ভাবনার মধ্যে ফেলে দিল। লেয়াকত আর আকলিমা পরস্পরে মুখ চাওয়াচাওয়ি করল। রইসুদ্দিন ‘অইতা পারে’ ভঙ্গিতে মাথা ঝাঁকাল। আম্বিয়া মুখ কুটকুট করে বলল, ‘এমন বেইট্টেনের কথা আমরার দাদিরার মুহেও হুনছি। আগে দিনে কলেরা ওলাবিবি সাইজ্জে এ্যামনে মাইনশের বাড়ি বাড়ি ঘুইরে রোগ ছড়াইত। এই বেডিরেও আমার এমন মনে অইতাছে।’
এ কথায় আকলিমা কেমন ঘাবড়ে গেল। সে লেয়াকতের হাত থেকে কুপিটা নিয়ে মেয়েলি উদ্বেগে গলা ভিজিয়ে বলল, ‘তুমি তো এই বেডিরে ধইরে বানছ। ছোঁয়াছুঁয়ি করছ। এখন কিস্তা অইলে…!’
বউয়ের এমন উৎকণ্ঠায় লেয়াকত রাগত স্বরে বলল, ‘আরে থউছেন এইতা আলাপ। কলেরার যুগ এহন আছেনি যে, বেইট্টেন আইব রোগ লইয়া।’
রইসুদ্দিন তখন বুদ্ধিমানের মতো বলে উঠল, ‘লেকত, এইতা বাদে অইবনে। এহন এই বেডির একটা হিল্লা কর। তুই আর আলম এহনই পুবপাড়া যা। কেনু মেম্বরে খবরটা দিয়া আ গা। যেইডে অইব, দশজনে মিল্লে করবনে। যা গা চালায়া।’
রইসুদ্দিনের কথামতো লেয়াকত তখনই আলমকে সাথে নিয়ে বেরিয়ে পড়ল পুবপাড়ার উদ্দেশে। আকলিমা একবার স্বামীর গমনপথের দিকে চেয়ে টলোমলো চোখে তাকিয়ে রইলাম খুঁটিতে বাঁধা পাগলির দিকে। মহিলাটিও কেমন ড্যাবডেবে চোখে তাকিয়ে আছে তার দিকে। পাশে দাঁড়ানো রইসুদ্দিন আর আম্বিয়া তখন যদি একটু গভীর চোখে তার দিকে তাকাত, দেখতে পেত হেঁশেলবন্দিনীর দিকে তাকিয়ে এই গৃহিণীর কুপির সলতেটি কেমন ধকধক করে কাঁপছে। আকলিমার চোখে টলোমলো অশ্রুকণা দেখে কুপির সলতেটিও কি ঝলকিয়ে উঠছে আগুনের অশ্রুবিন্দু চোখে?


